
নিজস্ব প্রতিবেদক: আগস্ট মাসে কুমিল্লায় ১১টি হত্যাকাণ্ড ও ৩৫টি চুরির মামলা হয়েছে। জেলায় জুলাইয়ের তুলনায় আগস্ট মাসে সার্বিক অপরাধ ও মামলার সংখ্যা বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন অপরাধে মামলা বেড়েছে ৭৬টি। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে মোট ৫৮৫টি মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০৯টি।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। জেলা প্রশাসক রোজি আক্তারের সভাপতিত্বে সভায় সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী। সভার শুরুতে তিনি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মাসিক চিত্র তুলে ধরেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আগস্টে খুন, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধ, আহতের ঘটনা, অস্ত্র উদ্ধার ও অপমৃত্যুর মামলা বেড়েছে। একই সময়ে জুলাইয়ে কোনো মামলা না থাকলেও আগস্টে একটি অপহরণ মামলা হয়েছে। তবে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও দস্যুতার মামলা কমেছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে কুমিল্লায় খুনের মামলা ছিল ১০টি। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। চুরির মামলা ৩১টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৫টি। জুলাইয়ে চাঁদাবাজির কোনো মামলা না থাকলেও আগস্টে দুটি মামলা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি ঘটেছে মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত মামলায়। জুলাইয়ে মাদক আইনে মামলা হয়েছিল ২১১টি। আগস্টে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮১টিতে। অর্থাৎ এক মাসেই মাদকসংক্রান্ত মামলা বেড়েছে ৭০টি।
এদিকে, আহতের ঘটনা জুলাইয়ের ১১২টি থেকে বেড়ে আগস্টে হয়েছে ১১৩টি। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও তিনটি থেকে বেড়ে ছয়টিতে দাঁড়িয়েছে। অপমৃত্যুর মামলা ৪৭টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৬১টি। পাশাপাশি জুলাইয়ে অপহরণের কোনো মামলা না থাকলেও আগস্টে একটি মামলা হয়েছে।
অন্যদিকে কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রে আগস্টে কমতির প্রবণতা দেখা গেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা জুলাইয়ের ৩০টি থেকে কমে আগস্টে হয়েছে ২১টি। ধর্ষণের মামলা ২২টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৭টিতে। দস্যুতার মামলা আটটি থেকে কমে হয়েছে সাতটি। তবে ডাকাতির মামলা জুলাই ও আগস্ট-দুই মাসেই দুটি করে অপরিবর্তিত রয়েছে। দাঙ্গার কোনো মামলাও দুই মাসে হয়নি।
সভায় জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়েও আলোচনা করা হয়। মুক্ত আলোচনায় নগরীতে চুরি, ছিনতাই ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানোর দাবি ওঠে। একই সঙ্গে নদীর দুই পাড়ের আগাছা পরিষ্কার, নগরীর বিভিন্ন সড়কের খানাখন্দ সংস্কার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ সময় ওষুধ প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করেন বক্তারা। বিশেষ করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে দামি ও অনিবন্ধিত শ্যাম্পু ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি সভায় উঠে আসে। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি কালেক্টরেট স্কুলে অধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন কুমিল্লা মডার্ন হাই স্কুলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার, দৈনিক কুমিল্লার জমিনের সম্পাদক শাহাজাদা এমরান, জেলা পরিবহন মালিক সমিতির সহসভাপতি জামিল আহমেদ খন্দকার এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য নাভিদ নওরোজ শাহ।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার বলেন, কুমিল্লার মানুষের জন্য নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিস, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি চালানোরও নির্দেশ দেন তিনি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার মনিটরিং জোরদারের নির্দেশ দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রতিটি বাজারে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। প্রতিটি দোকানে দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ক্রেতারা সহজেই পণ্যের নির্ধারিত দাম জানতে পারেন।
লোডশেডিংয়ের সুযোগে ট্রান্সফরমার চুরি, রেলস্টেশনে ছিনতাই ও চুরিসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। অপরাধীদের সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে তা গোপন রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর জন্য সাধারণ মানুষের প্রতিও আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
রেলওয়ের নিরাপত্তা জোরদার এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নে অর্থের প্রয়োজন হলে তা লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে রোজি আক্তার বলেন, এসব অনিয়মের বিষয়ে যারা অভিযোগ করবেন, তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।






.jpg)


