নিজস্ব প্রতিবেদক: লাকসামে কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪'র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা দাবিতে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদমর্যাদা, চাকুরী নিয়মিতকরণসহ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের শোষন, নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধ ও ভবিষ্যতে আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে অভিন্ন চাকুরীবিধি বাস্তবায়নের দাবিতে এ কর্মবিরতি পালন করছেন বিদ্যুৎ কর্মীরা।
সোমবার (৮ জুলাই) জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রেখে লাকসাম পৌর শহরের দক্ষিণ বাইপাস এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪ কার্যালয়ের সামনে কর্মবিরতি পালনকালে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ ও মানববন্ধন করা হয়।
মানববন্ধনে এজিএম (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) শহিদুল ইসলাম বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানে দ্বৈত নীতি চলতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকেই আমরা এ বৈষম্যের অবসান চাই। আমাদের মূল দাবি হচ্ছে- আরইবি-পবিসের অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়ন এবং অনিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক চাকুরীজীবিদের নিয়মিতকরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের দাবী সমূহের বিষয়ে আরইবি চেয়ারম্যান বরাবরে স্মারকলিপি দেয়ার পর দাবী না মেনে উল্টো চারজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। যা অত্যন্ত অমানবিক।
বিলিং সুপার ভাইজার ঝরনা রানি সরকার বলেন, আমাদের সাথে আরইবি'র অনেক বৈষম্য। বেতন বৈষম্য, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য, ৫% প্রনোদনা সরকার গত বছরের জুলাই মাসে দিলেও আমাদের দেয়া হয়েছে এ বছরের জানুয়ারি থেকে, ২০১৫ সালে সরকার ঘোষণা দিলেও আমাদেরকে শতভাগ পে-স্কেল দেয়া হয়নি।
বিলিং সুপার ভাইজার শানু রানি বলেন, আরইবি এবং সমিতি দ্বৈতনীতি চলমান রেখে দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের শোষন করছে। তারা যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আমরা তা পাই না। আমরা তাদের কাছে চাইতে হয় তা না হলে তারা আমাদের কথা ভাবেও না।
বিলিং সহকারী (কাজ নেই মুজুরি নেই 'কানামুনা') প্রিয়াংকা সাহা বলেন, আমার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। কিন্তু চুক্তির সাথে আমার কাজের কোন মিল নেই। চুক্তি মোতাবেক আমি দৈনিক মজুর পাই কিন্তু কাজ করি মাসিক ভিত্তিতে।
লাইন ক্রু লেভেল-১ আশরাফুল ইসলাম দুর্জয় বলেন, আমরা ২য় দফায় ৮ম দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করছি। প্রথম দফায় ৫ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত আন্দোলনের পর সরকারের তরফ থেকে আশ্বাস দিলে আমরা আন্দোলন স্থগিত করি। কিন্তু আমাদের দাবি-দাওয়া না মেনে নেওয়ায় আমরা আবারো আন্দোলনে নেমেছি। আমাদের চাওয়া হচ্ছে অভিন্ন সার্ভিস কোড চালু করতে হবে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। যা পল্লী বিদ্যুতের ইতিহাসে কোন সময় হয়নি। লাইন ক্রু লেভেল-১ চুক্তি ভিত্তিক। যে কাজে ঝুঁকি আছে, মৃত্যুবরণ করতে হয়, আহত হতে হয়, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়; সে কাজে চুক্তি কিভাবে হয়। এ পদে নিযুক্তদের স্থায়ী করতে হবে।
জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, আমরা বৈষম্যের শিকার। আরইবির সাথে আমাদের যে বৈষম্য তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমরা আন্দোলন করছি। আর আমাদের কিছু সহকর্মীর নিয়মিত করনের জন্য আমাদের এ আন্দোলন। বিভিন্ন সময় সরকারিভাবে আমাদের যে সুযোগ সুবিধা আসে আমরা তা পাই না। আমরা একই সার্ভিস কোডে চলার কথা। কিন্তু তারা এক সার্ভিস করে চলে, আমাদেরটা আরেক সার্ভিস কোডে চলে।
কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোঃ জাকির হোসেন বলেন, আমাদের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের চাওয়া পাওয়ার জন্য আন্দোলন করছে। এখন পর্যন্ত আমাদের জরুরী সেবা চালু রয়েছে, এখন পর্যন্ত কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। এখন পর্যন্ত তারা জরুরি সেবার কাজ করছেন, আবার দাঁড়িয়ে তাদের দাবিগুলোও প্রকাশ করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখছেন।
আন্দোলনরতরা আরও জানান, সমিতির এ কার্যালয়ে ৩৭৭ জন কর্মকর্তা কর্মচারী কর্মবিরতি পালন করছেন। সারাদেশে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মবিরতি পালন করছেন। এ বিষয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
আন্দোলনকারীদের দাবী ও অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-
* আরইবি পল্লী বিদ্যুতায়নের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে থাকলেও ফিল্ড লেভেলে অভিজ্ঞতা নেই।
* REB-Act 2013 অনুযায়ী আরইবি ও সমিতির কর্মচারী জনসেবক হলেও সরকার ঘোষিত যেকোন সুযোগ সুবিধা তারা সাথে সাথেই নেই,কিন্তু আমাদের দেরীতে এবং কমিয়ে বিভিন্ন ধাপে দিয়ে আসছেন।
* পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা নাই।কাজের পরিধি অনুযায়ী পর্যাপ্ত লোকবল নেই।
* গ্রাহকের জন্য সরবরাহকৃত নিম্নমানের মালামালে (মিটার, ট্রান্সফর্মার, ইন্স্যুলেটর, বিতরণ লাইনের তার ও অন্যান্য মালামাল) নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা বিঘ্নিত করছে।
* একই পদে বিভিন্ন ধাপে কর্মচারী নিয়োগ, যেমন: বিলিং সহকারী পদে 'নিয়মিত' ও 'কাজ নাই মজুরী নাই' পদে নিয়োগ, লাইন ক্রু পদে 'নিয়মিত' ও লাইন শ্রমিক।
* সুপারভাইজাররা একই পদে ১৫-২০ বছরে থাকলে হচ্ছে না প্রমোশন বা গ্রেডের কোন পরিবর্তন।সরকারী ২য় শ্রেনী, তয় শ্রেণী বা গ্রেডের সাথে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদমর্যাদা নির্ধারন করা নেই। ফলে সরকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করতে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
* বোর্ড থেকে একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত AE,AGM সমমান,আবার AGM থেকে প্রমোশনপ্রাপ্ত ডিজিএম রাও AE এর সমমান
* সরকার ঘোষিত ৫% প্রণোদনা ,২০১৬ সালের পে-স্কেল যথাসময়ে ও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হয় নাই।
* গ্রাহক সার্ভিসে বৃহস্পতিবার অর্ধবেলা অফিস থাকে ফলে গ্রাহক কোন সার্ভিস পায় না।
শনিবারে নামেমাত্র অফিস খোলা থাকলেও গ্রাহক কোন আবেদন, বিদ্যুৎ বিল অফিসে জমাসহ কোন সার্ভিস পায় না। অথচ অফিস খোলা রেখে অযথা কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে।
* পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোন পরিচয় নেই। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কি সরকারী, বেসরকারী, স্বায়ত্বশাসিত নাকি আধা-সরকারী -এসব বিষয়ে বিআরইবি বোর্ডকে বারবার স্পষ্টায়ন করে দাবি-দাওয়া জানানো হলেও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এসব সমস্যা নিরসনে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এসকল বৈষম্য নিরসনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি দুই দাবীতে কর্মবিরতিত পালন করছে। দাবি দুটির মধ্যে রয়েছে-
স্মার্ট ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আরইবি-পবিসের অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়ন এবং অনিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক চাকুরীজীবিদের নিয়মিতকরণ।
আন্দোলনকারীরা আরও জানান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদমর্যাদা (সরকার ঘোষিত গ্রেডিং ১-২০), ৬ মাস পিছিয়ে পে-স্কেল ও ৫% বিশেষ প্রণোদনা প্রদান, এপিএ বোনাস সমহারে না দেওয়া, লাইনম্যানদের নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা ও কাজের জন্য প্রয়োজনীয় লাইনম্যান ও বিলিং সহকারী পদায়ন না করা, যথাসময়ে পদন্নোতি না করা, লাইনক্রু লেভেল-১ ও মিটার রিডার কাম মেসেঞ্জার (চুক্তিভিত্তিক), বিলিং সহকারীর (কানামুনা) চাকুরী নিয়মিত না করা, স্মারকলিপিতে অংশগ্রহণ করায় ভোলা পবিস-এর এজিএম আইটি ও এজিএম অর্থকে সাময়িক বরখাস্ত, সিরাজগঞ্জ পবিস-২ এর ডিজিএম (কারিগরি) ও এজিএম আইটি-কে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে সংযুক্ত করাসহ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের শোষন, নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধ ও ভবিষ্যতে আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে অভিন্ন চাকুরীবিধি বাস্তবায়নের দাবিতে এ কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছে।








.jpg)


