ডেস্ক রিপোর্ট: ‘মা’ ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর গভীরতা আকাশসমান। পৃথিবীর মধুর শব্দ ‘মা’। জন্মের আগ থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ধাপে যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকেন, তিনি মা। সন্তানের হাসিতে যার আনন্দ, সন্তানের কষ্টে যার চোখ ভিজে ওঠে, সেই মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের বিশেষ দিনই ‘মা দিবস’।
প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এই দিনটি। তবে বাস্তবতা হলো, মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিটি দিনই হতে পারে মাকে ভালোবাসার দিন।
মা শুধু একটি সম্পর্ক নয়, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু, প্রথম নিরাপদ আশ্রয়। পৃথিবীর আলো দেখার পর শিশুর প্রথম পরিচয় হয় মায়ের সঙ্গে। শিশুর ভাষা শেখা, হাঁটা শেখা, ভালো-মন্দ বোঝা— সবকিছুর সূচনা মায়ের হাত ধরেই। তাই বলা হয়, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে একজন মায়ের।
বর্তমান সময়ের ব্যস্ত জীবনে মানুষ যখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তখন পরিবারে আবেগ ও সম্পর্কের জায়গাগুলো অনেকটাই সংকুচিত হচ্ছে। অনেক সন্তান কর্মব্যস্ততার কারণে মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে না। কেউ বিদেশে, কেউ শহরের দূরত্বে, আবার কেউ একই ছাদের নিচে থেকেও মায়ের খোঁজ নিতে ভুলে যায়। অথচ মা এমন একজন মানুষ, যিনি সন্তানের একটি ফোন কল বা ছোট্ট খোঁজেই আনন্দে ভরে ওঠেন। মা দিবস আমাদের সেই দায়িত্ব ও অনুভূতির কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
মা দিবসের ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক মা দিবসের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আনা জার্ভিস নামের এক নারী তার মায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে ১৯০৮ সালে প্রথম মা দিবস উদযাপন করেন। পরে ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালিত হতে শুরু করে। বাংলাদেশেও দিনটি এখন বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হয়।
তবে মা দিবস শুধু ফুল, উপহার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সম্মান হলো মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া এবং তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা। একজন মা সারাজীবন পরিবারের জন্য নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা ও আরাম বিসর্জন দেন। অনেক মা নিজের সুখের কথা না ভেবে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নিরলস সংগ্রাম করেন। তাই মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, আচরণেও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম কিংবা শহর— সব জায়গাতেই মায়েরা পরিবারকে আগলে রাখেন। একজন মা সংসারের হাজারো দায়িত্ব পালন করেও সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েরা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে নিরন্তর পরিশ্রম করেন। অনেক মা নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন। তাদের এই আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে অনন্য।
বর্তমান সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, যা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। যেসব মা একসময় সন্তানকে বুকে আগলে বড় করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে অনেকেই অবহেলার শিকার হন। এটি শুধু একটি পারিবারিক সংকট নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয়। মা দিবস আমাদের শেখায়— মায়ের প্রতি দায়িত্ব শুধু অর্থনৈতিক সহায়তায় শেষ হয় না; প্রয়োজন ভালোবাসা, সময় এবং সম্মান।
একজন মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ। সন্তানের ভুল, ব্যর্থতা কিংবা দুর্বলতার মাঝেও মা তাকে আগলে রাখেন। পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও মায়ের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তাই সাহিত্য, সংগীত, কবিতা ও চলচ্চিত্রে যুগে যুগে মায়ের ভালোবাসা বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু সাহিত্যিক তাদের লেখায় মায়ের অসীম মমতার কথা তুলে ধরেছেন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলামে মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’ এই একটি বাক্যই মায়ের মর্যাদা কতটা মহান, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। শুধু ইসলাম নয়, প্রায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
আজকের তরুণ প্রজন্মের উচিত মায়ের প্রতি আরও যত্নবান হওয়া। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন কিছু সময় মায়ের সঙ্গে কথা বলা, তার খোঁজ নেওয়া কিংবা ছোট ছোট কাজে সহযোগিতা করা সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। কারণ, সময় চলে গেলে অনেক কিছু ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু মায়ের ভালোবাসার বিকল্প কখনো পাওয়া যায় না।
মা দিবস আমাদের শুধু উদযাপন নয়, আত্মসমালোচনারও সুযোগ করে দেয়। আমরা কি সত্যিই মায়ের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি? আমরা কি তার ত্যাগের মূল্য বুঝতে পারছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি। কারণ একজন মা কখনো সন্তানের কাছে বিলাসিতা চান না; তিনি চান সামান্য ভালোবাসা, সম্মান ও আন্তরিকতা।
সবশেষে বলা যায়, মা হলো জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। পৃথিবীতে এমন কোনো ভাষা নেই, যা মায়ের ভালোবাসাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে। মা দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক মানবিক উপলক্ষ। আসুন, শুধু একটি দিনে নয়, প্রতিটি দিনে মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি। কারণ মা ভালো থাকলে, একটি পরিবার ভালো থাকে; আর পরিবার ভালো থাকলে সমাজ ও দেশও সুন্দর হয়ে ওঠে।
ভালো থাকুন পৃথিবীর সকল 'মা'। আর যে মা'য়েরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, মহান আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন। তাঁদের জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন, আমিন!
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানী সাগীরা।







.jpg)


