শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দুই নারী ও তিন শিশু (সবাই মেয়ে) রয়েছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে রেলওয়ে পুলিশ।
নিহতরা হলেন: নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর সালামত উল্লাহর ছেলে মো. বাবুল চৌধুরী (৫৩), ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টু মিয়ার স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬) ও তাঁর দুই মেয়ে খাদিজা আক্তার (৬) এবং মরিয়ম আক্তার (৪), চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের বিল্লার হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (৪৬), যশোরের চৌগাছার ফকির চাঁদ বিশ্বাসের ছেলে মো. সিরাজুল ইসলাম (৬২) ও তাঁর স্ত্রী কোহিনুর বেগম (৫৫), নোয়াখালীর সুধারামের মো. সেলিম মিয়ার ছেলে নজরুল ইসলাম রায়হান (৩৩), লক্ষ্মীপুর সদরের সিরাজুল দৌলার মেয়ে সায়েদা (৯), ঝিনাইদহ সদরের মোক্তার হোসেন বিশ্বাসের ছেলে মো. জোয়াদ বিশ্বাস (২০), মাগুরার মোহাম্মদপুরের ওহাব শেখের ছেলে ফসিয়ার রহমান (২৬) এবং চাঁদপুরের কচুয়ার মোমিনুল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম (৬৮)।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘চট্টগ্রাম মেইল’ ট্রেনটি রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীগামী ‘মামুন পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস রেললাইন পার হচ্ছিল। এ সময় দ্রুতগতির ট্রেনটি বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর বাসটি ট্রেনের ইঞ্জিনে আটকে প্রায় আধা থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
এতে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন। গুরুতর আহতদের স্থানীয়রা ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। আহতদের মধ্যে কয়েকজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেলেও অন্তত পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা:
স্থানীয় চা দোকানি আবু তাহের বলেন, “বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে দেখি ট্রেনটি বাসটিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে মানুষের চিৎকার আর কান্না ছিল।”
স্থানীয় বাসিন্দা শাহেনাজ আক্তার বলেন, “রাত পৌনে তিনটার দিকে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে দেখি রেললাইনের ওপর ছিন্নভিন্ন বাস পড়ে আছে। আহতদের চিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে।”
আহত যাত্রী তফাজ্জল হোসেন বলেন, “হঠাৎ জোরে ধাক্কা লাগে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবাই ছিটকে পড়ে। পরে দেখি আমি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছি, পুলিশ এসে হাসপাতালে নিয়ে যায়।”
রোববার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রেলক্রসিংয়ের দুই পাশের ব্যারিয়ার অক্ষত রয়েছে। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাসের ভাঙা অংশ ও কাঁচ। কিছু দূরে রেললাইনে বাসের চাকা পড়ে থাকতে দেখা যায়। গেটম্যানদের কক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার সময় গেটম্যান গেট না ফেলায় বাসটি রেললাইনে উঠে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের পর ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে টেনে নিয়ে যায়।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কার অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান জানান, নিহতদের পরিবারকে জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে বিভাগীয় ও জোনাল পর্যায়ে মোট তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উদ্ধার কাজ শেষ হলে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বেলা ১১টার পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।







.jpg)


